Binodon.com Bangla Story | Page-2
NetworkBanglaServices</a></td><td><a href=BanglaMagazinesKenakataBoimela

Binodon.com brings Bangla comics, Bengali jokes, Bangla golpo, Bengali story, Bangladeshi poem and kobita. Hada Voda, Nonte Fonte and Batul are popular Bengali comics. Bangla jokes, Bengali kabita, Bangla golpo, Bengali stories are also popular among Bangladeshis and Bengalis. Bangla stories, Bangla joke, Bengali comic, Bangladeshi golpo, Bengali poems, Bangla kobita. Entertainment in Bangla and Bengali.
You are here: Home Bangla Golpo Bangla Story
Decrease font size  Default font size  Increase font size 
Bangla Story
Bangla Golpo গল্প

41

-হিমালয়

চলন্ত বাস থেকে নামতে গিয়ে রাস্তার উপর যেভাবে হুমড়ি খেয়ে পড়ল আরমান, তাতে প্রবল সম্ভাবনা ছিল চাকায় পিষ্ট হওয়ার; কিন্তু আজরাইল হয়ত তখন অন্যকোথাও ব্যস্ত ছিল, তাই যাত্রায় মৃত্যু অপ্সরার পিলে চমকানো হাসি দিয়েই মিলিয়ে গেল, তাকে স্পর্শ করলনা সম্ভবত চুপিসারে মৃত্যু তাকে বলে গেল -‘তোমার নির্বুদ্ধিতায় আমি যারপরনাই অভিভূত হয়ে আরেকটা জীবন ব্যবহারের সুযোগ দিয়ে গেলাম’, কারণ তার গন্তব্যস্থল ছিল দিনাজপুর, কিন্তু বাস ঢাকা ছেড়ে আসার কয়েকঘণ্টা পর আচমকা সে বাস থেকে নামতে উদ্যত হয়_ ঢাকা-দিনাজপুরের মধ্যবর্তী কোন জেলাশহর হবে সেটা; সেখানে কোন বাস স্টপেজ নেই বিধায় চালকসহ অন্যযাত্রীরা তাকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা চালায়, কিন্তু সে নামার জন্য বদ্ধপরিকর- অগত্যা চলন্ত বাস থেকেই নামতে হল, আর তখনই পা হড়কে ডিগবাজি দিয়ে রাস্তায় পড়ল, সেসময় বাসের পেছনের চাকা থেকে তার মাথার দুরত্ব ছিল কয়েক সেন্টিমিটার- এতে চাকার ফাকে আটকে থাকা ধূলির অনেকটাই তার মুখে প্রবেশ করল, আর ডিজেলের উৎকট গন্ধটাকেও হজম করতে হল ইপিটোমাইজার হিসেবে! বাসের হেলপার পাদানি থেকে কিছু একটা অশ্লীল মন্তব্য করল তার এই অবিমৃষ্যকারীতায়, কিন্তু ওকে জবাব দেয়ার আগেই বাসটি দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে গেল!

আরমানের খেয়ালগুলো বরারবরই খামখেয়ালে রূপ পেয়ে যায় শেষাবধি; আজকের এই ভ্রমণটিও কোন পূর্বনির্ধারিত কিছু ছিলনা- আজ ছুটির দিন হওয়ায় গতকাল রাতেই ঘুমুতে যাবার আগে সে একটা পরিকল্পনার ছক কষেছিল : সকালে টিকেটকাউন্টারে এসে লাস্ট স্টপেজের টিকেট কিনবে, মোবাইল থাকবে বন্ধ, মানিবাগ সঙ্গে রাখবেনা- টাকা থাকবে শার্ট-প্যান্টের পকেটে, এরপর চলতে চলতেই কোন একজায়গায় টুপ করে বাস থেকে নেমে পড়বে, সারাদিন সেই এলাকায় ঘুরে বেড়িয়ে রাতের স্নিগ্ধ প্রকৃতি দেখতে দেখতে বাসায় ফিরবে_ একটি আসন্ন ভোরের তৃষ্ণার্ততায় তার শরীর শিরশির করছিল

রাস্তার পিচের সঙ্গে ঘর্ষণে হাতে বেশ বড় একটা ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে, সেখান থেকে চুইয়ে চুইয়ে রক্ত ঝরছে- ক্ষতস্থানটাকে অন্যহাতে চেপে ধরে সে রাস্তার প্রান্তধরে হেটে চলল- সামনে নিশ্চয়ই কোন বাজার পাওয়া যাবে, সেখানকার কোন ফার্মেসী থেকে লিকোপ্লাস্টার যোগাড় করে এই রক্তবিপ্লবকে দমন করাই আপাতত প্রাথমিক উদ্দেশ্য!
বেলা সাড়ে দশটা বেজে গেছে; এসময় তার স্মরণে এল সকালে নাস্তা খাওয়া হয়নি- বাসার কেউ ঘুম থেকে জাগার আগেই সে নি:শব্দে দরজা খুলে বেরিয়ে এসেছে, এতক্ষণে নিশ্চয়ই দুশ্চিন্তার চিত্রপ্রদর্শনী শুরু হয়ে গেছে বাসায়, হয়ত টিকিট কেটে -১জন প্রতিবেশীও সেই প্রদর্শনী দেখতে এসেছে! বিশেষত মায়ের উৎকণ্ঠিত চেহারাটা কল্পনা করে এই ইচড়ে পাকা রোদের মধ্যেও তার হাসি পেল ইতিমধ্যে সে একটি বাজারে এসে পৌছেছে, লিকোপ্লাস্টারও লাগানো হয়েছে আহতস্থানে, এই মুহূর্তে সে বসে আছে একটি হোটেলে- নাস্তা বা প্রমিত বাংলার প্রাতঃরাশ হিসেবে পরোটা-ডিম তার পছন্দ, চা খুব একটা খাওয়া না হলেও এই দোকানের চা পরিবেশনের ধরনে চাটাও অর্ডার দেয়া হয়েছে এখানকার চা পরিবেশন করা হয় কাচের গ্লাসে, আর চায়ের রঙটা এমন যে দেখে মনে হয় গ্লাসের ভেতরে এটেল মাটি গুলে দেয়া হয়েছে! আরও একটি জিনিস তার নাস্তার আইটেমে স্থান পেয়েছেসিগারেট; এমনিতে সিগারেটের গন্ধে তার মস্তিষ্ককম্প শুরু হয়, ধোঁয়ায় কাশতে কাশতে নাকে-মুখে পানি চলে আসে, তবুও আজ যেন পুরো দিনটাই নিয়ম ভঙ্গের, রূপার উপরে আলকাতরার প্রলেপ লাগিয়ে কয়লায় রূপার প্রলেপ দেয়ার
সিগারেটের স্বাদটাকে সোডিয়াম নাইট্রেট এর মত লাগল আরমানের কলেজে প্র্যাকটিকাল করার সময় কৌতূহলবশত একবার সোডিয়াম নাইট্রেট মুখে দেয়ার পরের ৩০মিনিট ব্যয় হয়েছিল শুধু থুথু ফেলেই; আজ অবশ্য একটা ইগলু আইসক্রিমই সিগারেটের বিস্বাদকে দূর করে দিয়েছে, তবে দুর্গন্ধটা শরীরে চুলকানি ছড়িয়ে দিয়েছে যেন- অস্বস্তিটা ঠিক, প্রকাশ করা যাচ্ছেনা
হোটেলের একটু সামনেই সিনেমা হল- রঙবেরঙের পোস্টার দেখা বোঝা গেল শাকিব খান, অপু বিশ্বাসের কোন সিনেমা চলছে বন্ধুমহলে হলে গিয়ে বাংলা সিনেমা দেখাটা চরম বিদ্রূপাত্মক ঘটনা, সুতরাং তার এবারকার গন্তব্য সিনেমা হল
অসহ্যরকম উদারতা সত্ত্বেও ১ঘণ্টার বেশি হলে থাকা সম্ভব হলনা তার- ভেতরটা ঠাসাঠাসি তো বটেই, চেয়ারগুলো ভাঙ্গাচোরা, অধিকাংশ ফ্যানই অচল, সেইসাথে সিগারেট আর অ্যামোনিয়ার সংমিশ্রণে সৃষ্ট দুর্গন্ধটা
নাড়িভুড়ি সিদ্ধ করে ফেলতে চাইছিল পাশাপাশি, একটি অনাকাঙ্ক্ষিত উৎপাতও যোগ হয়েছিল- তার পিছনের সিটে বসা দুজন বোরখা পরিহিতা দর্শক নিচুস্বরে ক্রমগতপঞ্চাশ, পঞ্চাশকরতে করতে যথেষ্ট বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিলওদের ইঙ্গিতটা দুর্বোধ্য নয়, তার সুষুপ্তমনেও একটা বেপরোয়া ইচ্ছা মৃদু সম্মতিসূচক চাপ দিচ্ছিল বোধহয়; সুতরাং প্রস্থানটাই শ্রেষ্ঠ option হয়ে উঠে, যদিও প্রস্থানকালে নারী দুটির উপহাসের হাসি হারপুন হয়ে বিধছিল তার পৌরুষে!

ইচড়ে পাকা রোদটা রীতিমত সন্ত্রাসী হয়ে উঠেছে এখন- সে দরদর করে ঘামছে, অথচ সঙ্গে রুমাল বা ট্যিসু পেপার নেই_ তার চেহারাটা হয়েছে দেখবার মত! হলের সামনে একটা রিক্সাস্ট্যান্ড- সেটির পাশ দিয়ে হেটে যাওয়ার সময় নতুন একটা চিন্তা প্রসব করল তার উৎপাদনশীল মস্তিষ্ক- রিক্সায় শহরটা ঘুরে দেখলে কেমন হয়!

আরমান এখন রিক্সায় ; ২ঘন্টাচুক্তিতে একটা রিক্সা পাওয়া গেছেরিক্সাওয়ালা ইচ্ছামত সারাশহর ঘুরিয়ে দেখিয়ে আবার এই হলের সমানে ফিরিয়ে আনবে, এমনটাই স্থির হয়েছে
শহরের রাস্তাগুলো ভীষণ সরু, বড় কোন যানবাহন ভুলক্রমে ঢুকে পড়লে দীর্ঘ্ জ্যাম বেধে যায়, রাস্তার দুইপাশে দোকানপাট, মানুষের আনাগোনা, সিডির দোকানগুলোতে সাম্প্রতিক প্রকশিত বালাম- হাবিবের গান বাজছে- খন্ড খণ্ড দৃশ্যাবলী চলন্ত রিক্সা থেকে উপভোগ করছে সে; সঙ্গে ক্যামেরা না থাকায় আফসোস তো ছিলই, সেটি দ্বিগুণ হল কলেজের সামনের রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময়- কলেজের মাঠটাকে মনে হল সবুজ-চাদর, সেখানে ক্রিকেট খেলছে ছেলেরা, মাঠের পাশেই বেশ বড় একটা দিঘি- দুপুরের রোদে দিঘির পানিকে রূপালি রঙের লাগছে দূর থেকে_ এই দৃশ্যগুলো ক্যামেরায় কেমন অপরূপ লাগত সেটা ভাবতে গিয়েই আনমনে চোখ বন্ধ করে ফেলল সে

রিক্সাটা মূলশহরের একটু বাইরে মহাসড়কে উঠে এসেছে, এখানকার রাস্তা বেশ চওড়া, দুইপাশের নাম না জানা গাছগুলো ছায়াপহরী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে অনেকটা শরীরে শরীর ছুঁয়ে, রাস্তার নিচের সমতলভূমিতে যতদূর চোখ যায় কেবল হলদে সরিষাক্ষেত- হলুদ ফুলগুলোর আড়ালে লুকিয়েছে নীল আকাশ, আরমানের জীবনের এক অভূতপূর্ব দৃশ্য! আরও কিছুদূর যাওয়ার পর একটি বিশেষ কাঠামোর বিল্ডিংয়ে তার দৃষ্টি এমন ফ্লেভিকলের মত আটকে গেল যে রিক্সাওয়ালাকে থামার নির্দেশ দিল- বিল্ডিংটা দেখতে অবিকল ইংরেজি 41 সংখ্যাটির মত; ঢাকা তো বটেই টেলিভিশননেও ধরনের ডিজাইন কখনো নজরে পড়েনি তার

কী হইল মামা, আর আগাইবেননা?এইএকচল্লিশ্যা আশ্রমেযাইবেন নাকি?’-রিক্সাওয়ালার প্রশ্নে ঘোরভঙ্গ হল তার
এখানে কি সবাই যেতে পারে?-আরমানের জিজ্ঞাসার জবাবে রিক্সাওয়ালাটি লুঙ্গিতে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বলল- পুরাই পাগলের আখড়া অইডা, গ্যালেই বুঝবেন শুনচি বাইরের মানুষরে ভিতরে যাইতে দ্যায়না, তয় ওগো কাউরে কিচু পযসা দিলে কাম হইবার পারে
ভিতরে না গেলে পাগলের আখড়া বুঝলেন কিভাবে?- এই প্রশ্নের পর রিক্সাওয়ালাটি হাসতে শুরু করল- আরে মামা, আপনে আইজকাই এইখানে পরথমবার আইলেন, আর আমরা থাকি সারাবছর এই আশ্রমডার বয়স পরাই ১০বছর হইবো, অনেক মাইনষেই গ্যাছে-আইছে; তাগো কাছে শুনছি ওই আশ্রমের দরজা-জানালা-ফ্যান-লাইট-রুম সবকিচুই নাকি ৪১টা কইরা আরেকখান তামাশা হইল, আশ্রমের মানুষও নাকি ৪১জন এই কথাডা, আশ্রমের একজনের কাছেই শুনচি- হ্যায়, আমার রিক্সায় উঠছিল একদিন
অদম্য এক কৌতূহল মনের নিয়ন্ত্রণভার গ্রহণ করল আরমানের, তাই রিক্সার ভাড়া পরিশোধ করে সে আশ্রমের দিকে এগিয়ে গেল
আশ্রমের কাছাকাছি এসে নামফলকটায় নজর পড়ল- ‘41বিদ্যাশ্রম ধীরপায়ে ভেতরে প্রবেশ করল সে আশ্রমের সামনেই একটি প্রকাণ্ড শিলকড়ই গাছ, তাঁর ছায়ায় গিটার হাতে একজন লোককে বসে থাকতে দেখে তার কাছেই গিয়ে থামলো- লোকটার বয়স ৩০ এর কাছাকাছি হবে তাকে দেখে লোকটি গিটার বাজানো থামিয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালে – ‘জ্বি মানে, আমি ঢাকা থেকে আসছিলাম, আপনাদের আশ্রমটা দেখে ভাল লাগল’- কম্পিতকন্ঠে বলল সে
আপনি ঢাকা থেকে এসেছেন?আহ, কতদিন ঢাকায় যাইনা, সেই যে দশবছর আগে এখানে আসলাম! বসুন, বসুন; আপনার কাছে ঢাকার গল্প শুনি’- লোকটি যথেষ্ট আন্তরিকভাবে তার সাথে কথা বলতে থাকল
সে- জড়তা ভেঙ্গে মুখ খুলল- ঢাকার গল্প কী বলবো, আমিতো এখনও এই আশ্রমের ধাধাটাই ধরতে পারছিনা; ‘41বিদ্যাশ্রমআবার কোনধরনের আশ্রম!তাছাড়া আসারপথে শুনলাম, এখানকার সদস্যসংখ্যা ৪১জন, ৪১দরজা, ৪১জানালা, এইজাতীয় কথা-বার্তা
-
ঠিকই শুনেছেনকেন জানিনা আপনার সঙ্গে কথা বলতে বেশ ভাল লাগছে, তাই আপনাকে কয়েকটা বাড়তি কথা জানানোই যায়; আপনি চাইলে এটাকে আশ্রম বলতে পারেন, জাদুঘর বলতে পারেন, এমনকি অফিসও বলতে পারেন
-
মানে?-সে অবাক হল
-
জাদুঘর এই অর্থে যে, আমরা এখানে ৪১সংক্রান্ত যাবতীয় তখ্য সংগ্রহ সংরক্ষণ করি দর্শন-ইতিহাস-জোতির্বিজ্ঞান-সংখ্যাতত্ত্ব-সাহিত্য-সঙ্গীত-খেলাধুলা-পদার্থ-রসায়ন-জীববিজ্ঞান, যেটাই বিবেচনা করেন না কেন, সর্বক্ষেত্রে ৪১ নিয়ে কখন কী হয়েছে বা হচ্ছে সেই তথ্য নিদর্শন আমাদের সংগ্রহে আছেআবার, আশ্রমও বলতে পারেন,কারণ এখানে সবকিছুই ৪১ এর আদলে হয়- অনেকে ঈশ্বরের উপাসনা করেন, পাঠচক্র পরিচালনা করেন_ এগুলো যেমন আরাধনা, আমরাও তেমনি ৪১এর আরাধনা করি ১০ই ফেব্রুয়ারী আমাদের প্রধান উৎসব, কারণ এটা বছরের ৪১তম দিন- এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গকে আশ্রমে ঐদিন নিমন্ত্রণ করা হয়, রাতভর নাচ-গান চলে এছাড়া ২১শে মে, ২৯শে আগস্ট, এবং ৭ই ডিসেম্বর যথাক্রমে বছরের ১৪১,২৪১ ৩৪১তম দিন হওয়ায় এদিনগুলোতেও বিশেষ আয়োজন থাকে বাকি রইল অফিস প্রসঙ্গ- সত্যি বলতে কি,আমরা ৪১জনই বেতনভোগী কর্মচারীমাত্র; ৫টি স্কেলে আমরা বেতন পাই- প্রতিস্কেলে ১০জন করে- এভাবে ৪টি স্কেল, আর বাকিজনের ১টি স্কেল স্কেলগুলো ৪১৪১,৮২৪১,১২৩৪১,১৬৪৪১ এবং একজনের ২০৫৪১টাকা সেই একজনের জন্য বিশেষ পোশাক থাকে, যেটিতে উল্টো করে 41 লেখা থাকে- বলা চলে আশ্রমটার রক্ষণাবেক্ষন চলে তারই তত্ত্বাবধানে- এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন, আমিই সেইজন
আরমানের মনে হল কেউ তাকে আফিম খাইয়ে দিয়েছে; লোকটিকে কি তার সাথে রসিকতা করছে?অসহায়ের মত সে বলল- ভাই, আপনার কথা তো কিছুই বুঝলাম না- চাকরি, বেতন, ৪১উপাসনা.. এগুলো তো আলিফ লায়লার কাহিনীর মত লাগছে আপনাদের বাকিরা কোথায়?
-
হা হা, ১০বছর আগে আমারও এমনটাই লেগেছিল বাকিরা দুপুরের খাবার খাচ্ছে ভেতরে , আমি একা খাই শুনুন, এই পুরো আশ্রমটা যিনি চালান, তিনি ঢাকায় থাকেন, বেতন-ভাতা উনিই দেনপ্রায় ১২বছর আগে উনি এটা গড়ে তুলেন এর ২বছর পর আমার সঙ্গে পরিচয় হয় উনার, সেসময় আমি অনার্স পাশ করে বেকার ঘুরছি ঢাকায়- সারাদিন গান-বাজনা করে বেড়াই, উনিই তখন এই আশ্রমে পাঠিয়ে দেন আমিসহ মোট ৪১জনকে মূলত এখানকার সবাই একসময় বেকার-ভবঘুরে হয়ে সমাজের নিচুতলার মানুষ ছিলাম- এখানে কেউ আমার মত গান গায়, কেউ কবিতা লিখে, আবার বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনাওয়ালারাও আছেন তবে আমরা শুরুর দিককার মাত্র ১০জনই এখনও টিকে আছি- ৬মাস পর পর আশ্রমের সদস্য বদল হয় বলতে পারেন, ৬মাস মেয়াদী একটি পর্যবেক্ষণ চলে এখানে- প্রতিসপ্তাহে উনি এখানে আসেন, তখন প্রত্যেককে নিজেদের কার্যক্রমের রিপোর্ট দিতে হয়, এভাবে ৬মাসজুড়ে মূল্যায়ন চলে, এর ভিত্তিতে প্রমোশন-ডিমোশন হয়, যাদের পারফরমেন্স আশানুরূপ হয়না তারা আশ্রমের সদস্যপদ হারান
এতক্ষণে বোধহয় আরমানের মধ্যে শিহরণ সৃষ্টি হল- অদ্ভুত, সত্যি অদ্ভুত! উনি কবে আসেন, আমি উনার সঙ্গে দেখা করতে চাই, একটিমাত্র প্রশ্ন করতে- হঠাৎ ৪১কেই কেন উনি যাবতীয় ধ্যানধ্যারণা ধরলেন!
-human psychology’
কতটুকুইবা আমরা বুঝতে পারি বলুন; আপনার এই প্রশ্নটা আমরাও বিভিন্ন সময়ে উনাকে করেছি, কোন সদুত্তর পাইনি তবে দীর্ঘদিনের আলাপচারিতায় কয়েকটি বিষয়কে কারণ হিসেবে সন্দেহ করেছি- উনি অসম্ভব মেধাবী ছাত্র ছিলেন, কিন্তু একবার জনৈক শিক্ষকের সঙ্গে কোন একটা বিষয়ে ব্যাপক বাদানুবাদ হয়, পরে সেই কোর্সে উনি সম্ভবত ৪১ পেয়ে কোনরকমে পাশ করেছিলেন, যেজন্য ভার্সিটির লেকচারার হবার সুযোগ হারান আবার, এমনও ধারণা হয়েছে যে, উনি উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে জার্মানী যাওয়ার ৪১দিন পর উনার সবচেয়ে বড়ভাই মারা যান ৪১বছর বয়সে; এর বাইরে আরও একটি কারণ অনুমান করেছি- ভার্সিটজীবনে উনি এক সহপাঠিনীর প্রতি বিশেষভাবে দুর্বল ছিলেন, কিন্তু নানামুখী গবেষণায় সময় দিতে গিয়ে ভাল লাগার কথাটি আর বলা হয়ে উঠেনি, ইত্যবসরে ফাইনাল ইয়ারে গিয়ে ভার্সিটিরই এক লেকচারারের সঙ্গে বিয়ে হয়ে যায় সেই রমণীর- তার রোলনন্বর ছিল ৪১!এগুলো সবই অনুমান, তবুও আপনার অবগতির জন্য বলি, উনি আজ সকালেই আশ্রমে এসেছেন, এখন একটু বাইরে আছেন- সম্ববত নতুন যে আশ্রমটা খুলতে চাচ্ছেন, সেটার জন্য জমি দেখতে বেরিয়েছেন
আরমান ঢোক গিলল- আবার আশ্রম?সেটা কী নিয়ে হবে?
-
জানিনা, বিষয়ে প্রশ্ন করা আমাদের এখতিয়ারবহির্ভূত সে যাই হোক, উনি এসে পড়বেন হয়ত কিছুক্ষণের মধ্যে, তার আগে আপনাকে একটা গান শোনাই, গানটির টইটেলই #41 (লোকটি গিটার তুলে নিল হাতে)
Come and see
I swear by now I'm playing time against my troubles
Oh oh
I'm coming slow but speeding
Do you wish a dance and while
I'm in the front
The play on time is won
Oh but the difficulty’s coming here
I will go in this way
And I find my own way out
আরমানের নিস্পৃহায় গানটা এখানেই থামিয়ে দিল লোকটি- কী ব্যাপার, টাইটেলের সাথে মিল না পাওয়ায় গান শুনে বিরক্ত হচ্ছেন? গানটার পেছনের ইতিহাস খুবই ইন্টারেস্টিং- এটা Dave Matthews নিজেই তার band এর জন্য লিখেছিলেন, এর আগে তাদের অধিকাংশ গান লিখতেন হফম্যান, কিন্তু সাংস্কৃতিক রুচিগত বিরোধে band থেকে বহিষ্কৃত হফম্যান গানের কপিরাইট চেয়ে আদালতের শরণাপণ্ন হলে ব্যথিত Matthews এই গানটি লিখেন এটা ছিল ব্যান্ডের ৪১তম গান, নানাঘটনার প্রেক্ষিতে গানের নম্বরটিকেই শেষপর্যন্ত টাইটেল করা হয়
-
হুম বুঝলাম, কিন্তু ইংরেজি গান বেশ দ্রুতগতির, ধরতে সমস্যা হয়; আপনারা বাংলায় কোন ৪১সঙ্গীত করতে পারেননা?
লোকটি দুইদিকে মাথা ঝাকাল- এটা একটা ভয়ানক সমস্যা, আমাদের এখানে লেখক যিনি, তিনি বেশ কয়েকটা গান লিখেছেন, কিন্তু কোনটাই ন্যুনতম গ্রহণযোগ্যতা পায়নি, একারণে ১বছর আগে উনার বেতন ১২৩৪১টাকা থাকলেও, ডিমোশন হতে হতে সেটা এখন ৪১৪১ এসে ঠেকেছে- আশঙ্কা করছি এই আগস্টেই তার সদস্যপদ বাতিল হয়ে যাবে ২দিন আগে আরেকটা গান লিখে আমার কাছে জমা দিয়েছেন, কয়েকলাইন আপনাকে শোনাই-
৪০নও, ৪২ও নও; ৪১এ প্রিয়তুমি হও
যে কথা হয়না বলা- ৪১ নাও, বুঝে নাও
নীরবতায় অধীরতা ছিল, ইশারাতে শ্বাস কাছে এল
৪১ দাড়িকমা নেই, ভাললাগা তাই আসে নিমেষেই
ব্যথার পৃষ্ঠে হারায় কথা; ৪১এ তুমি বুঝবেই।।
লোকটি এই পর্যায়ে গান থামিয়ে দিল- ধুর, বাঙালি এই আমি-তুমি ছাড়া কিছু চেনেনা নাকি? নিয়ে গান লিখতেও আমি-তুমি ছেড়া কাথা নিয়ে টানাটানি! বাই দি ওয়ে, আপনি দুপুরে কিছু খেয়েছেন?আমাদের এখানে তো বাইরের মানুষের পানাহার নিষিদ্ধ, নইলে আপনার একটা ব্যবস্থা করা যেত
-
আচ্ছা, আশ্রমের মালিক তো এখানে নিয়মিত থাকেননা, তাহলে নিয়মের এত কড়াকড়ি কেন?
-
আরে, কড়াকড়ি মানেই তো শৈথিল্যের পূর্ণ নিশ্চয়তা; বিষয়টা তুললেন যখন, তাহলে বলেই ফেলি- এই ছেলেভুলানো নিয়মগুলো শুধু এই একদিনের জন্যই, আপনি কল্পনাও করতে পারবেননা আশ্রমে কী হয় প্রতিদিন- মদ, জুয়া, প্রমোদবালার আনাগোনা, সবই হালাল এখানে আর, হবে না- বা কেন? এতদীর্ঘ জীবনটা এভাবে একটি অর্থহীন সংখ্যা খুঁজেই ব্যয় করবো- জীবনটা কি এতই সস্তা? তাই সপ্তাহের শেষ দুটি দিন কাজে ডুবে থেকে রিপোর্ট তৈরি করি, বাকি ৫দিন কে কী করলাম, তাতে কেউ হস্তক্ষেপ করিনা আমার মনে হয় কি জানেন, এই লোকটা বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী, নয়তো এধরনের উদ্ভট পরিকল্পনা কেউ করে?ভবঘুরেদের পুনর্বাসন দিতে চাইলে তাদের কোন উপযুক্ত কাজে লাগানো যেতনা? তার প্রতিবন্ধীতার আরও একটা দৃষ্টান্ত দেই- গতসপ্তাহে উনি ঘোষণা করেছেন, ৪১ আদৌ মৌলিকসংখ্যা নয়, এটা যে প্রমাণ করে দিতে পারবে তাকে ৪১লক্ষ টাকা পুরস্কার দেবেন_ ব্যস যারা জীবনে কোনদিনই অংকের চৌদ্দসীমায় পা মাড়ায়নি, তারাও রাতদিন পরিশ্রম করে যাচ্ছে অর্থের লোভে, যারা অংক জানে তাদের প্রসঙ্গ নাহয় মুলতবিই রাখলাম
আশ্রমের গেট দিয়ে একটা গাড়ি প্রবেশ করল এসময়; ‘ঐতো উনি এসে গেছেন’-বলে লোকটি গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল, আরমানও উদভ্রান্তের মত তাকে অনুসরণ করল

গাড়ি থেকে যে লোকটি নামল,তার বয়স সম্পর্কে ধন্ধেয় পড়ে গেল সে- ৫৭ হতে পারে, ৪৭ও হতে পারে, তারচেয়েও অবাক ব্যাপার হচ্ছে লোকটিকে এর আগেও সে কোথাও দেখেছে, এমন একটা দোটানা মনে কাজ করতে লাগল; তার অবাকের মাত্রাকে বিবর্ধিত করে লোকটিই তার দিকে পরিচিতিসূচক দৃষ্টিতে তাকাল- তুমি আরমান, am I right?
-
জ্বি, কিন্তু আপনি আমাকে কিভাবে চেনেন, বলবেন?- হতবিহ্বল সে শুধু এটুকুই বলতে পারল
-
আরে, আমি তোমার বড়চাচার বন্ধু, গতমাসেও তো তোমাদের বাসায় গেলাম, একসঙ্গে টিভিতে আষ্ট্রেলিয়া-সাউথ আফ্রিকার খেলা দেখলাম, তোমার টিউশনি ছিল বলে কিছুক্ষণ পরেই বাইরে চলে গেলে; এটা আমার একটা গুণ বলতে পার- কাউকে একবার দেখলে সেই চেহারাটায় সীলমোহর একে দেয় মস্তিষ্ক যাইহোক, তুমি এখানে কী করছো?
-
এমনি ঘুরতে এসেছিলাম, যদিও আশ্রমের ভেতরে ঢোকার অনুমতি মেলেনি এখনো
-
আশ্রমের নিয়মটাই এমন বাবা, তবে তোমার জন্য সেটা প্রযোজ্য নয় আমাদের এখন ৮২ মিনিটের একটা সাপ্তাহিক রুদ্ধদ্বার বৈঠক হবে, ইত্যবসরে আমার ড্রাইভার তোমাকে পুরো আশ্রমটি ঘুরিয়ে দেখাবে, আশ্রমের পিছন দিকটাতেও বেশকিছু দর্শনীয বস্তু আছে- তুমি ঘুরতে থাকো, ফেরার সময আমার গাড়িতে তোমাকে লিফট দেব, তখন ভ্রমণবৃত্তান্ত শুনবো, কেমন?
লোকটি আশ্রমের একটি বিশেষ কক্ষের দিকে হেটে চলল, এসময় সঙ্গের সেই গীটার বাদক আরমানের দিকে তাকিয়ে এক অদ্ভুত হাসি দিল বিনা কারণেই!

গাড়ির পিছনের সিটে গুটিসুটি হয়ে বসে আছে আরমান, পাশে বসা লোকটি একাগ্রভাবে ল্যাপটপে লিখেই যাচ্ছে, একসময় পাশের নিশ্চুপ তরুণটিকে লক্ষ্য করল সে- কী ব্যাপার আরমান, এত চুপচাপ কেন? এরকম একটা আশ্রম দেখে আসলে, কোনই প্রশ্ন নেই?
আরমানের হাতের তালু ঘামতে শুরু করেছে, ইতস্ততভাবেই সে বলল- আসলে এত প্রশ্ন জমা হয়েছে যে সঠিক প্রশ্ন বাছাই করতেই হিমশিম খাচ্ছিভাবছি , এই আশ্রম প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য কী হতে পারে!
ল্যাপটপে চোখ রেখেই লোকটি কথা চালিয়ে যেতে লাগল- তোমাকে দেখে আমার বুদ্ধিমান বলেই মনে হচ্ছে, তাই সরাসরিই উত্তর দেই- বলতে পার, আশ্রমটা আমার একটা গবেষণাগার আমি নেশা করিনা, জুয়া খেলিনা, অন্যকোন আকর্ষণও নেই একদিন হঠাৎ করেই বুদ্ধিটা আসল মাথায়
-
কিন্তু আপনি কী নিশ্চিত এরা আপনার কাজের মূল্যায়ন করছে?আমারতো ধারণা ওরা আপনাকে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ভাবে
হা হা হা’-লোকটির হাসি যেন থামতেই চাইছেনা, কোনক্রমে হাসি চেপে সে পুনরায় কথা শুরু করল- আচ্ছা, আমি কী আমার উদ্দেশ্যের কথা বলেছি তোমাকে? দেখ, ওরা যে আশ্রমে কী করে বেশ ভালমতই বুঝতে পারি, সত্যি বলতে কি আমিও এটাই চাই তুমি নিশ্চয়ই, আশ্রম প্রতিষ্ঠার কারণটা শুনেছো ইকবালের মুখে- এগুলো আমিই বিভিন্নসময় ওদের ভাবতে প্রলুব্ধ করেছি বিভ্রান্তি সৃষ্টির উদ্দেশ্যে, আশ্রম প্রতিষ্ঠার আসল কারণটা আমিও জানিনা তুমি নিশ্চয়ই, ৪১লক্ষ টাকার পুরস্কারের ঘোষণাটাও শুনেছো- আচ্ছা, তুমিতো বিজ্ঞানের ছাত্র শুনেছি, বলতো ৪১ মৌলিক সংখ্যা নয়, এটা পাগল ছাড়া অন্যকেউ প্রমাণ করতে পারবে?এটা হলে তো সংখ্যাতত্ত্বই বাতিল হয়ে যাবে, অথচ ওদের উৎসাহটা যদি দেথতে! আমি মানুষের চিন্তাকে সংকীর্ণ করে দিতে চাই, তাদের মস্তিষ্ককে অচল করতে চাই, সেজন্যই এই সুদীর্ঘ নাটকের মঞ্চায়ন চলছে এতকাল ধরে সাফ কথা বলি, আমি এদেরকে গিনিপিগ হিসেবে ব্যবহার করছি, এবং প্রতি ৬মাস পরপর নতুন কিছু গিনিপিগ যোগাড় করিতবে, মজার ব্যাপার হচ্ছে- ইদানীং ওরাও বোধহয় আমাকে ওদের গিনিপিগ ভাবছে; আসলে প্রকৃত সত্য কি জানো- প্রতিটি মানুষই একে অপরকে সজ্ঞানে হোক, অবচেতনে হোক, গিনিপিগ ভাবে- শাসক যেমন ভাবে শোষিতকে, একইভাবে শোষিতের কাছেও শাসক একটা গিনিপিগ, কিন্তু আমরা শুধু একপাক্ষিকভাবেই দেখে অভ্যস্ত
আরমানের সাময়িক বাকরোধ ঘটল- বলার মত কথা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা, অন্যদিকে ল্যাপটপ টিপতে টিপতে পাশের লোকটি গুনগুন করে bruce springsteen এর গান গাইতে লাগল-
If you miss the train I'm on, you will know that I am gone
You can hear the whistle blow a hundred miles
a hundred miles, a hundred miles, a hundred miles, a hundred miles
You can hear the whistle blow a hundred miles

Lord I'm one, Lord I'm two, Lord I'm three, Lord I'm four
Lord I'm 500 miles from my home
হঠাৎ প্রগলভ হয়ে উঠে আরমান- সত্যি করে বলুনতো, আপনার এই ৪১ম্যানিয়ার আসলেই কি কোন কারণ নেই, কিংবা নতুন